২ অক্টোবর ২০২৬
২ অক্টোবর ২০২৬
কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ০৩:১৮ PM
জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২১শে আগস্ট ২০২৬ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি ২০শে আগস্ট ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি স্বতন্ত্র, মর্যাদাপূর্ণ ও পরিচ্ছন্ন নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সততা, সংযম, উদার, মানবিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য সর্বমহলে সুপরিচিত। গণমানুষের এই রাজনীতিবিদ সংবেদনশীল, সংস্কৃতিমনা ও অসাম্প্রদায়িক। আবার একইসঙ্গে ধর্মভীরু ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী।
ছাত্রজীবনের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকারে প্রতিনিধিত্ব, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরবর্তীতে দীর্ঘদিনের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন—বহু বাঁক পেরিয়ে রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ যাত্রার মধ্য দিয়ে তিনি আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত। তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা কেবল রাজনৈতিক পদ-পদবির ধারাবাহিকতা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, প্রতিকূলতার মুখে অবিচল থেকে বহুবার কারাবরণ ও অকথ্য নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেও দায়িত্বের প্রতি অপরিসীম ত্যাগ ও নিষ্ঠা এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা ও আদর্শে অটল থাকার এক দীর্ঘ ইতিহাস।
প্রারম্ভিক জীবন ও পারিবারিক ঐতিহ্য
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬শে জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার অটোয়ারী থানার মির্জাপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যসম্পন্ন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মির্জা রুহুল আমিন ও মাতার নাম ফাতেমা আমিন। তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। তিনি প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য এবং বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এবং মৎস্য ও পশু সম্পদ মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে মির্জা পরিবারের একাধিক সদস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ, যিনি ১৯৭৯ সালে ঢাকার একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের ভূমিমন্ত্রী (১৯৭৮-৭৯) ও আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী (১৯৯১-৯৬) ছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার (১৯৭৯-৮২) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস.আর. মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের অধীনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সে সময়ে নবগঠিত যুব শিবির অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে মনোনীত হন। তাঁর অন্য এক চাচা বাবলু মির্জা এবং তাঁর ভগ্নিপতি ড. আবুল কালাম বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মির্জা ফখরুল ইসলামের বড় মামা আবু জাহেদ ইবনে ইউসুফ ছিলেন দিনাজপুর জেলা স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের শীর্ষস্থানীয় নেতা। জনাব আলমগীরের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচিত পৌরসভা মেয়র ছিলেন। তাঁর বড় ভগ্নিপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জনসেবা, স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক এবং সামাজিক অঙ্গনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পরিবারের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও অবদান তাঁর জনভিত্তি ও জনপ্রীতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শিক্ষাজীবন ও ছাত্র আন্দোলনে অবদান
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ ঠাকুরগাঁওয়ে সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬০-এর দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সেই সময় তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগদান করেন। তিনি সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে সংগঠনটির বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় মির্জা আলমগীর সংগঠনের মর্যাদাপূর্ণ পদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম সংগঠক হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির অধ্যায়
শিক্ষাজীবন শেষে মির্জা ফখরুল সরাসরি পেশাদার রাজনীতিতে না গিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (শিক্ষা ক্যাডার)-এ যোগ দেন এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজ, ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে তিনি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন।
জনাব আলমগীর ১৯৭৯ সালে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস.এ. বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে এস.এ. বারীর পদত্যাগের পর তিনি আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান এবং ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন।
সক্রিয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন
সরকারি চাকরির নিরাপদ কর্মজীবন ছেড়ে ১৯৮৬ সালে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং তিনি তৃণমূলের রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে দেশব্যাপী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে জনাব আলমগীর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসার আগে তিনি বিএনপির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহ-সভাপতি এবং পরবর্তীতে দীর্ঘদিন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল প্রথমে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পরবর্তীতে ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তরে উঠে আসেন। ২০১১ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব প্রদান করেন। পাঁচ বছর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১৬ সালের ১৯শে মার্চ বিএনপির মহাসচিব হিসেবে পূর্ণ দায়িত্ব পান। এই দীর্ঘ সময় তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারক ও মুখপাত্র হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসার পর থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অধ্যায় কেটেছে আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী শাসন এবং সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে মোকাবিলা করেছেন। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্বে দিয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, সমাবেশ ও আন্দোলনে দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস ও জনাব তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সময়ে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সচল ও নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজপথের আন্দোলন পরিচালনা করতে গিয়ে তাঁকে বারবার মিথ্যা ও হয়রানিমূলক হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি অন্তত ১১ বার কারাবরণ করেন এবং জীবনের প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংযম ও ধৈর্য বজায় রাখার বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে উঠে এসেছে।
সংসদ সদস্য ও সরকারের দায়িত্ব
২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জনাব আলমগীর তাঁর নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময়ে তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে জয়লাভ করেন। তবে, দেশজুড়ে ব্যাপক ভোট কারচুপির কারণে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং একই বছরের ১৭ই ফেব্রুয়ারি তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণের আগ পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক দর্শন ও ব্যক্তিত্ব
শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ দর্শনে বিশ্বাসী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সবসময় গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আইনের শাসন, মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক সহাবস্থান, সহনশীলতা এবং জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখতে কাজ করে গেছেন। একইসঙ্গে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ, দুর্নীতি, দখলদারিত্ব, প্রশাসনিক অনিয়ম ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের কঠোর বিরোধিতা করে গেছেন।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য গঠনে তিনি জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট এবং পরবর্তীতে যুগপৎ আন্দোলনের প্লাটফর্ম গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর রাজনৈতিক চেতনায় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি বহুদলীয় গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও তরুণদের স্বপ্ন বিদ্যমান। তিনি জাতীয় সমঝোতা (Reconcilation) ও মীমাংসার রাজনীতিতে আস্থা রাখেন। রাজনৈতিক মহলে তিনি একজন শিক্ষিত, পরিশীলিত ও সংযত বক্তা হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাঁর ব্যক্তিত্ব, পরমতসহিষ্ণুতা ও রাজনৈতিক শালীনতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকেও তিনি শ্রদ্ধা ও সম্মান পেয়ে থাকেন। রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতি ও সাহিত্যের প্রতিও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। শিক্ষকতা, প্রশাসন, সংসদ, সরকার এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক নেতৃত্ব—এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও পরিণত করেছে। ব্যক্তিগত মানুষ হিসেবে তাঁর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক তাঁর সাংস্কৃতিক সত্তা−অধ্যয়ন, নাটক, অভিনয়, আবৃত্তি, শিক্ষকতা ও ক্রীড়াক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা তাঁকে তুলনামূলকভাবে একজন সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও মানবিক আবহের রাজনীতিবিদ হিসেবে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে।
ব্যক্তিগত জীবন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্যক্তিগত জীবনে রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন এবং ঢাকায় একটি বীমা কোম্পানিতে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এই দম্পতির দুই কন্যা মির্জা শামারুহ এবং মির্জা সাফারুহ। মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করেন এবং পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি অব অস্ট্রেলিয়া থেকে ডক্টরেট ও পোস্ট ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়া সরকারের অধীন চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণায় একজন সিনিয়র বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। কনিষ্ঠ কন্যা মির্জা সাফারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি স্বনামধন্য স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ: নতুন অধ্যায়ের সূচনা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০শে আগস্ট ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে ১৯৯১ সালের পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ২১শে আগস্ট ২০২৬ তারিখে বঙ্গভবনের দরবার হলে অনুষ্ঠিত এক আনুষ্ঠানিক শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান। সাংবিধানিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেন। বিশেষ সাংবিধানিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা হয়ে ওঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন এক কথায়—সংগ্রাম, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে আসার ইতিহাস। তাঁর জীবনের এই দীর্ঘ পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও সর্বোচ্চ সংযম ও ধৈর্য প্রদর্শন, নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য, জনসম্পৃক্ততা এবং সর্বাবস্থায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস। ব্যক্তিগত জীবনে বুদ্ধিভিত্তিক, উদার, অত্যন্ত নির্মোহ, সজ্জন, দক্ষ, সহনশীল ও মার্জিত চরিত্রের এই ব্যক্তিত্বের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্ব গ্রহণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।